রবিবার; ১৬ জুন, ২০২৪ খ্রি. Dashboard

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন দিন
সর্বশেষ :
হু হু করে বাড়ছে তিস্তার পানি, নদীপাড়ে আতঙ্ক কুড়িগ্রামের উলিপুরে নিরাপত্তা নিশ্চিতে ৩২টি সিসি ক্যামেরা বসালো পুলিশ ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কুড়িগ্রামে ব্যস্ত সময় পার করছেন কামারেরা কুড়িগ্রামে বিভিন্ন পশুর হাটে জেলা পুলিশের নিরাপত্তা জোরদার কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুরে সরকারি বিতরণকৃত চাল জব্দ
16 December

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

উত্তরাঞ্চরের মরণ ফাঁদ তিস্তা ব্যারেজ

প্রকাশিত: মঙ্গলবার; ১১ জুন, ২০২৪ খ্রি. - ০৪:১৯ পি.এম. | দেখেছেন: ২৯ জন।

উত্তরাঞ্চরের মরণ ফাঁদ তিস্তা ব্যারেজ

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

 

তিস্তা নদীঃ


সিকিম হিমালয়ের ৭,২০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত চিতামু হ্রদ থেকে এই নদীটি সৃষ্টি হয়েছে। নদীটি নিলফামারী জেলার কালীগঞ্জ সীমান্ত এলাকা দিয়ে ১৭৮৭ খ্রিস্টাব্দের অতিবৃষ্টি একটি ব্যাপক বন্যার সৃষ্টি করেছিল এবং সেই সময় নদীটি গতিপথ পরিবর্তন করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধা জেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়ে চিলমারী নদীবন্দরের দক্ষিণে ব্রহ্মপুত্র নদে পতিত হয়।

তিস্তা নদীর সর্বমোট দৈর্ঘ্য ৩০৯ কিমি, তার মধ্যে ১১৫ কিমি বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অবস্থিত। তিস্তা একসময় করতোয়া নদীর মাধ্যমে গঙ্গার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল এবং এর অংশবিশেষ এখনও বুড়ি তিস্তা নদী নামে পরিচিত।

 

গজলডোবা (তিস্তা) ব্যারেজঃ

২২১ দশমিক ৫৩ মিটার দীর্ঘ, ৪৪ গেটবিশিষ্ট গজলডোবা বাধের রয়েছে ৩ টি পর্যায়। প্রথম পর্যায় সেচ প্রকল্প, দ্বিতীয় পর্যায় পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং তৃতীয় পর্যায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র সংযোগ খাল খনন করে নৌপথ তৈরী।

সিকিম এন্ডারসন সেতুটি দার্জিলিং কালিংপং সড়কে অবস্থিত, যার ২৫ কিলোমিটার ভাটিতে করনেশন সেতু। এরই ভাটিতে সিভক শহরের কাছে তিস্তা নদী ডুয়ার্সের সমতলে প্রবেশ করেছে। তারও ১৫ কিলোমিটার ভাটিতে গজলডোবায় এ ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছে। গজলডোবার ৭০ কিলোমিটার ভাটিতে তিস্তা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। গজলডোবার এই বাঁধে ফটক রয়েছে ৪৪ টি, যা বন্ধ করে তিস্তার মূলপ্রবাহ থেকে পানি বিভিন্ন খাতে পুনর্বাহিত করা হয়। নদী বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, তিস্তার পানি তিস্তা-মহানন্দা খালে পুনর্বাহিত করার উদ্দেশ্য নিয়েই এ বাঁধ স্থাপন করা হয়েছে। 

২ হাজার ৯১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা-মহানন্দা খালের মাধ্যমে জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ দিনাজপুর, কোচবিহার ও মালদহ জেলায়ও সেচের পানি সরবরাহ হচ্ছে। কার্যত তিস্তার পানি গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে বিহারের মেচী নদীর দিকে প্রবাহিত করা হচ্ছে। সেখান থেকে ফারাক্কার উজানে এ পানি ফুলহার নদের মাধ্যমে পুনরায় সরবরাহ করা হবে। মেচী নদীতে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, ফলে উত্তরবঙ্গ ও বিহারে ভারতের আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনাও সম্পূর্ণ হবে।

জাতিসংঘের সাবেক পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ এসআই খান বলেন, ভারত ইতোমধ্যে এ নদীতে ৬টি বড় বাঁধ দিয়েছে। এছাড়া ছোট সেচ প্রকল্পের জন্য তিস্তার উপনদীগুলোতে দেয়া হয়েছে আরও অসংখ্য বাঁধ। জলবিদ্যুত কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে ৩০টির মতো। এছাড়া আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের হিমালয় ১নং সংযোগ খালের মানস সাংকোচ-তিস্তা গঙ্গা সংযোগ খালের কাজও সম্পন্ন করেছে ভারত। ভারত সরকার তিস্তায় গজলডোবা বাঁধের মাধ্যমে উজানে জলাধার থেকে পানি সরাসরি ফারাক্কা বাঁধের উজানে গঙ্গা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও ভারত তিস্তা বেসিনের পানি মহানন্দা বেসিনেও সরিয়ে নিচ্ছে। গঙ্গা থেকে আরেকটি সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তার পানি দক্ষিণাত্যেও সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা ভারতের রয়েছে।

 

তিস্তার পানিবন্টন চুক্তি বনাম ১ কোটি লোকের জীবিকাঃ

তিস্তা নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে লালমনিরহাট জেলার ডালিয়া পয়েন্টে। এই নদী বাংলাদেশের প্রায় ১২ টি জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে মিলেছে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল এবং এই ১২ টি জেলার অর্থনীতি প্রত্যক্ষভাবে তিস্তা নদীর ওপর নির্ভরশীল। তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের মোট চাষযোগ্য জমির শতকরা ১৪ ভাগ তিস্তা নদীর সেচ প্রকল্পের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৪ % মানুষের জীবিকা তাই এই নদীর ওপর প্রত্যক্ষভাবে নির্ভরশীল। প্রায় ৬০০ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি চাষের জন্য পানি প্রয়োজন ৩৫০০ কিউসেক। কিন্তু বর্তমানে তিস্তার পানি প্রবাহ ৬০০ থেকে ৭০০ কিউসেক যেখানে ১৯৮৫ সালে পশ্চিম বঙ্গের গজল দোবায় বাধ নির্মান কাজ শুরু করার আগে তিস্তার পানি প্রবাহ ছিল প্রায় ৫০০০ কিউসেক। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের পানি-ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত বলেন যে, ‘তিস্তার মূল প্রবাহ ভারত প্রত্যাহার করে নিয়েছে। তিস্তায় ডালিয়া ব্যারাজে উজান থেকে আসা পানিপ্রবাহ প্রায় শূন্য। এখন যে ৬০০-৭০০ কিউসেক পানি যা আসছে তা, ধারণা করি, ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের ভাটির উপনদী থেকে।

 

বাংলাদেশ অনেক দর কশাকশি করেও তিস্তা চুক্তিতে এগুতে পারে নাই। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তি চাইলেও পশ্চিম বঙ্গ সরকারের অনিচ্ছার কারনে এই চুক্তিতে এগোন যাচ্ছে না। বাংলাদেশের একটি বৃহৎ ভুখন্ড এবং সেই ভুখন্ডের বাসিন্দারা প্রত্যক্ষভাবে তিস্তা নদীর ওপর নির্ভশীল । ভারত বাংলাদেশকে তার পানির ন্যায্য হিস্যা দিচ্ছে না। যার সরাসরি ফলাফল হিসেবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল এবং বৃহৎ জনঙ্গষ্ঠি হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ দেখা দিচ্ছে।

 

তবে সাম্প্রতিক কালে সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি। ভৌগলিক কারনে উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টি কম হয়। তাই বৃষ্টির কারনে বন্যা হবার সম্ভাবনা কম। ভারত গজলডোবা ব্যারেজের গেট হঠাৎ করে খুলে দিলে উত্তরাঞ্চলে বন্যা দেখা দেয়। বর্ষাকালে তলদেশে অজস্র পাথর, নুড়ি, বালি আর পলি পড়ে তিস্তার বুকে শুষ্ক মৌসুমে উত্তপ্ত বালুর স্তুপ। অন্যদিকে বর্ষাকালে মুল গতিপথ বদলিয়ে তিস্তা প্রচন্ডভাবে আছরে পড়ে দুই তীরে। ফলে নির্দয় ভাঙ্গনে প্রতি বছর ২০ হাজার মানুষ বাড়িঘর, গাছপালা, আবাদী জমি হারিয়ে পথের ভিখেরী হয়। নদীর প্রবাহ পথে বিশাল চর ও উভয় তীরে ভাঙ্গনের তান্ডবে তিস্তার বাংলাদেশ অংশে এর প্রস্থ কোন কোন জায়গায় ৫ কিলোমিটারেরও বেশী। কোন জায়গায় ৫০০ মিটার।

 

গত এক সপ্তাহ যাবৎ উত্তরাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ভারত পূর্বের ন্যয় এবারেও গজলডোবার বাধ ছেড়ে দিলে এই বন্যা পরস্থিতি দেখা দেয়। বন্যা পরিস্থিতির চরম অবনতির কারনে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মানুষ চরম মানবেতর জীবন যাপন করছে।

 

এখানে বাংলাদেশের পলিসি মেকার এবং কূটনীতিকদের চরম ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে। আমাদের দেশের পলিসি মেকাররা এবং কূটনীতিকরা তাদের কূটনৈতিক সাফল্য দেখাতে চরম ভাবে ব্যর্থ।

 

 

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন