মঙ্গলবার; ৩ মার্চ, ২০২৬ খ্রি. Dashboard

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন দিন
সর্বশেষ :
ইরানে হামলার ৪৮ ঘণ্টা: যে ১০ বিষয় গতিপথ নির্ধারণ করছে সরকারকে বলব, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করুন: নাহিদ ইসলাম কিশোর গ্যাং দিয়ে ডিপোর কয়লা চুরি ইয়াবা কারবারের প্রতিবাদ করায় কয়লা ব্যবসায়িকে হত্যাচেষ্টা ভোলাহাট সীমান্তে ডিএনসির অভিযানে ইয়াবাসহ নারী আটক-১ অস্তিত্বহীনতায় কুড়িগ্রামের ১১ নদ-নদী, সংকটে নদী কেন্দ্রীয় জীব বৈচিত্র্য

ইরানে হামলার ৪৮ ঘণ্টা: যে ১০ বিষয় গতিপথ নির্ধারণ করছে

প্রকাশিত: সোমবার; ২ মার্চ, ২০২৬ খ্রি. - ১০:৩৪ পি.এম. | দেখেছেন: ৩০ জন।

ইরানে হামলার ৪৮ ঘণ্টা: যে ১০ বিষয় গতিপথ নির্ধারণ করছে

 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর প্রায় ৪৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেছে। এ সময়ে তেহরানের আকাশে অনেকটাই দাপট দেখিয়েছে যৌথ শক্তি। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র তাদের সর্বোচ্চ নেতাকে হারিয়েছে। জবাব দিতে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানছে। চলছে ক্ষেপণাস্ত্রের হিসাব-নিকাশ। সবমিলিয়ে এখন পর্যন্ত হওয়া ঘটনাগুলো পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যাচ্ছে তা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন।

ইরানের আকাশে আধিপত্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার রাতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার অবশিষ্ট যা কিছু ছিল তা ধ্বংস করে দিয়েছে। সেখানে আগে থেকে খুব বেশি কিছু ছিল না। কারণ গত এক বছরে ইসরায়েলের আগের হামলাগুলোতে ইরানে রাশিয়ার সরবরাহ করা বেশিরভাগ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

আমেরিকান এবং ইসরায়েলি পক্ষ এখন ইরানের আকাশে পূর্ণ আধিপত্য বজায় রেখেছে বলে মনে হচ্ছে। এর অর্থ হলো, এই সংঘাত চলাকালে এবং পরেও মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমানগুলো নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকির মধ্যে ইরানের আকাশে ইচ্ছামতো উড়তে পারবে।

ইরানি নেতৃত্বের বিশৃঙ্খলা
ট্রাম্প জানিয়েছেন, অভিযানের শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আলি খামেনিসহ ইরানের ৪৮ জন শীর্ষস্থানীয় নেতা নিহত হয়েছেন। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর দেশটিতে মাত্র একবার ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। এমন একটি দেশে শীর্ষ নেতাদের হারানোর ঘটনা নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তা তৈরির কথা। রোববার এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেছেন, তাদের সামরিক ইউনিটগুলো সম্ভবত স্বাধীনভাবে কাজ করছে। ওপরের স্তরের চেইন অব কমান্ডের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ নেই। এটি বোঝায় খোদ ইরানি কর্মকর্তারাই নিশ্চিত নন বর্তমানে কে দায়িত্বে আছেন।

উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা
খামেনির স্থলাভিষিক্ত করার প্রক্রিয়াটি তাদের সংবিধান অনুযায়ী চলমান। এর অর্থ হলো- প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং মনোনীত একজন ধর্মীয় নেতার সমন্বয়ে গঠিত একটি অন্তর্বর্তী পরিষদ তাত্ত্বিকভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। কিন্তু তাদের কাউকেই জনসমক্ষে দেখা যায়নি। ইসরায়েলি ও মার্কিন বিমানগুলো ইরানের নেতৃত্ব লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ যেখানে বসবাস করেন বলে ধারণা করা হয়, সেই এলাকার আশপাশে গত শনিবার হামলার খবর পাওয়া গেছে।

আরও একটি বিষয় হলো, খামেনির কোনো স্পষ্ট উত্তরসূরি নেই। অন্যতম শীর্ষ পদপ্রার্থী এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি দুই বছর আগে এক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী ও খামেনির ছেলে মোজতবা বেশ কিছু বাধার সম্মুখীন হতে পারেন। নির্দিষ্ট উত্তরসূরির অনুপস্থিতিতে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তি আগামী দিনগুলোতে আরও বেশি দুর্বল হতে পারে।

ক্ষেপণাস্ত্রের হিসাব-নিকাশ
ইসরায়েল ও মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা করে ইরান জবাব দিচ্ছে। অন্যদিকে যৌথ শক্তির লক্ষ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা- বিশেষ করে লঞ্চারগুলো অকেজো করে দেওয়া। কারণ এই লঞ্চারগুলোই নির্ধারণ করে ইরান একসঙ্গে কতগুলো ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে পারবে। যদিও ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছানোর মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের কাছে সীমিত, কিন্তু ইরাক বা উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো কাছাকাছি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য তাদের কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল মজুত আছে। এগুলো ব্যবহারের আগে সাধারণত বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে এবং লুকিয়ে রাখা হয়। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে ইরানের লঞ্চারগুলো কতটা সক্রিয় থাকবে; তার ওপর যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ হতে পারে।

উপসাগরীয় দেশ: যখন যুদ্ধের ময়দানে
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত এবং ওমানে মার্কিন ঘাঁটির পাশাপাশি বেসামরিক অবকাঠামো, হোটেল ও আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ শুধু ঘাঁটির কথা বললেও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড প্রকাশিত তালিকায় আবাসিক স্থানের কথাও এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলো সংঘাতের বাইরে থাকতে চেয়েছিল। কিন্তু ইরানের হামলা এখন তাদের যুদ্ধের ভেতরে টেনে আনছে। বর্তমানে আলোচনা চলছে কীভাবে এর জবাব দেওয়া যায়। যদি উপসাগরীয় কোনো দেশ ইরানে পাল্টা হামলায় অংশ নেয়, তবে তা যুদ্ধের পরিসর বাড়িয়ে দেবে।

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি রোববার এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে তারাও অভিযানে অংশ নিতে পারে।  

আপতত চীন-রাশিয়া অনুপস্থিত
ঐতিহাসিকভাবে ইরান সবসময় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে তাদের কৌশলগত অংশীদারত্বের কথা প্রচার করে এসেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য ইরান রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সরবরাহ করেছে। নিজেরাও রাশিয়ার সরবরাহ করা বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল ছিল। সেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাগুলো এখন ধ্বংস হয়ে গেছে। রাশিয়ার পক্ষে সেগুলো প্রতিস্থাপন করার ক্ষমতা নেই। অন্যদিকে চীন ইরানের সস্তা তেলের ওপর নির্ভরশীল। হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে তাদের বৈশ্বিক বাণিজ্যের স্বার্থ জড়িত। কিন্তু খামেনির মৃত্যুর পর এই দুই দেশ খুব সামান্যই প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। এই অবস্থান পরিবর্তনের সম্ভাবনাও খুব কম। ফলে যুদ্ধের ময়দানে ইরানকে কার্যত একাই লড়াই করতে হবে।

প্রক্সিদের বড় প্রতিক্রিয়া নেই
প্রথাগত যুদ্ধের বাইরেও ইরানের কিছু অস্ত্রভাণ্ডার আছে। যেমন- সাইবার হামলা, প্রক্সি মিলিশিয়া এবং সামুদ্রিক পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি। সেগুলো এখন পর্যন্ত অনেকাংশেই নিষ্ক্রিয় বলে মনে হচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিলেও তা থেকে পিছিয়ে গেছেন। দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রক্সি গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইতোমধ্যেই বেশ বিপর্যস্ত। এখন পর্যন্ত তারা ইরানের উত্তর সীমান্তে সরাসরি যুদ্ধে জড়ায়নি। ইরাকের মিলিশিয়ারা এরবিল বিমানবন্দরে ড্রোন ছুড়লেও, বাগদাদের নেতারা এই সংঘাতের বাইরে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। এই নিষ্ক্রিয়তা দুটি সম্ভাব্য বিষয়ের ইঙ্গিত দেয়- বিশৃঙ্খলা অথবা বড় কোনো প্রস্তুতি।

জ্বালানি খাতে ধাক্কা
ইরান সংশ্লিষ্ট যেকোনো দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত তেলের দাম বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে যদি হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে পড়ে। ইরান এই প্রণালীটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করুক বা না করুক, ঝুঁকি বাড়লে দাম বাড়বে এটাই নিশ্চিত। পরিস্থিতি সামাল দিতে গত রোববার সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর জোট ওপেকের সদস্য রাষ্ট্রগুলো প্রতিদিন ২ লাখ ৬ হাজার ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তা সত্ত্বেও, রোববার সন্ধ্যায় বাজার খোলার সঙ্গে সঙ্গে দাম ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।

তবে কয়েক দশক আগের মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি সংকটের তুলনায় বর্তমান বিশ্ববাজারের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্র এখন বিশ্বের বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী দেশ। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রপ্তানি ব্যাহত হওয়ার কারণে বিশ্ববাজারে দামে যে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দিচ্ছে, তা সম্ভবত দীর্ঘস্থায়ী হবে না।

উত্তেজনা বেশি, ফলাফলে জোর কম
সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র বিমান, নৌ, গোয়েন্দা কিংবা কারিগরি সবদিক থেকে এগিয়ে। ইরান যদি পরিস্থিতিকে বেশি উত্তপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আরও আঘাত হানতে পারবে। তাতে ইরানের নেতৃত্বই দুর্বল হবে। কিন্তু কেবল সামরিক সুবিধা দিয়ে সবসময় রাজনৈতিক ফলাফল নির্ধারণ হয় না। এ কারণে হয়তো তেহরানের নতুন নেতারাও তাদের বিপ্লবী আদর্শ এবং পশ্চিমাবিরোধী মনোভাব বজায় রাখার ব্যাপারে দৃঢ় থাকবেন।

শেষটা স্বাভাবিক হবে না
যুদ্ধ একবার শুরু হলে তা নিজস্ব গতিতে চলতে থাকে। এমন অনেক পরিস্থিতির উদ্ভব হয় যা শুরুতে ভাবা হয়নি। এই অভিযান ঠিক কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মাথায় ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব। ওয়াশিংটন এখন পর্যন্ত সামরিক সাফল্য পেয়েছে। কিন্তু তারা কীভাবে শেষ করবে সেটির স্পষ্ট ‘এক্সিট পয়েন্ট’ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। 

এখন সরকারবিরোধী ইরানিরা বিক্ষোভ করলে, প্রশাসন ফের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে দমনের চেষ্টা করবে। সেক্ষেত্রে দমন-পীড়ন ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বিমান শক্তি ব্যবহার করবে কি না, তা একটি বড় প্রশ্ন। এই প্রশ্নটিই এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

 

 

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন