কুড়িগ্রামে বিপিসি'র নির্দেশনা ঘিরে বিভ্রান্তি, ডিজেল পাচ্ছেন না কৃষকরা
আনোয়ার সাঈদ তিতু,
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
জ্বালানী তেলের সরবরাহ ও বিতরণ নিয়ে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ফিলিং স্টেশনগুলো থেকে বিভিন্ন পরিবহনে জ্বালানী তেল সরবরাহে সীমা বেঁধে দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)।
কিন্তু কৃষকদের জমিতে সেচ কাজ এবং নৌযান চলাচলে ব্যবহৃত শ্যালো ইঞ্জিনে জ্বালানী হিসেবে ডিজেল সরবরাহে সুনির্দিষ্ট কোনও নির্দেশনা না থাকায় জেরিকেন ও ড্রামে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে কুড়িগ্রামের ফিলিং স্টেশনগুলো। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক ও নৌযান সংশ্লিষ্টরা।
কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ফিলিং স্টেশনগুলো জেরিকেন কিংবা ড্রামে তেল সরবরাহ বন্ধ রাখায় বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। বোরোর ভরা মৌসুমে সেচ মেশিনের জ্বালানী ‘সংকট’ তৈরি হওয়ায় কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। একই সাথে ঈদ যাত্রায় নৌপথে যাতায়াত সংকট সৃষ্টির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিপিসির নির্দেশনা অনুযায়ী, ফিলিং স্টেশন থেকে যানবাহনে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা যাবে।
সে অনুযায়ী মোটরসাইকেল সর্বোচ্চ দুই লিটার এবং প্রাইভেটকার সর্বোচ্চ ১০ লিটার অকটেন বা পেট্রোল নিতে পারবে। প্রাইভেটকার, জিপ ও মাইক্রোবাসের ক্ষেত্রে প্রতি ট্রিপে ২০ থেকে ২৫ লিটার পর্যন্ত অকটেন বা পেট্রোল নেওয়ার সুযোগ থাকবে। এছাড়া মিনিবাস ও লোকাল বাস ৭০ থেকে ৮০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল নিতে পারবে। আর দূরপাল্লার বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও কনটেইনার ট্রাকের জন্য প্রতি ট্রিপে ১০০ থেকে ১২০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল সরবরাহ করা যাবে।
কিন্তু বিপিসির এই নির্দেশনায় কৃষি ও নৌযানের ডিজেল চালিত শ্যালো ইঞ্জিনের জ্বালানী সরবরাহে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা না থাকায় জেরিকেন ও ড্রামে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে ফিলিং স্টেশনগুলো। এতে বিড়ম্বনায় পড়েছেন কৃষক ও নৌযান সংশ্লিষ্টরা। কুড়িগ্রাম জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের বড়াইটারী গ্রামের কৃষক মোঃ শরিফুল জানান, তার জমিতে সেচ দেওয়া প্রয়োজন। গ্রামে বিদ্যুত সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় এলাকার বেশিরভাগ কৃষক শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে সেচ পাম্প চালান। শনিবার সকালে স্থানীয় একটি ফিলিং স্টেশনে জেরিকেনে করে ডিজেল নিতে গেলে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি তেল না পেয়ে ফিরে যান। মোঃ শরিফুল বলেন, ‘ হঠাৎ করে তেল দেওয়া বন্ধ করছে। জেরিকেনে তেল দেয় না।
আমরা জমিতে পানি দিবো কেমন করে? শ্যালো মেশিন তুলি আনি তেল নিয়া যামো নাকি? কৃষকের কথা কেউ চিন্তা করে না! জমিত পানি না দিলে আবাদ কেমন করি হইবে!’ শনিবার দুপুরে কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার রায়গঞ্জের একটি ফিলিং স্টেশনে জেরিকেনে করে ডিজেল নিতে গিয়ে তেল ছাড়াই ফিরে আসেন আরেক কৃষক মোঃ চাঁন মিয়া। ষাটোর্ধ মোঃ চাঁন মিয়া তার জমিতে কীভাবে সেচ দিবেন এ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। নিরুপায় হয়ে ফিরে যান তিনি। মোঃ চাঁন মিয়া বলেন,‘ হামরা এলা তেল কোটেই পামো।
তেল ছাড়া পানি দেওয়ার বুদ্ধি নাই। টানের (খরা) দিন। এই সময় ধানত (ধানের জমিতে) পানি না দিলে আবাদ হবার নয়। না খায়া মরা লাগবে।’ শুধু ভূরুঙ্গামারী কিংবা নাগেশ্বরী নয়, কুড়িগ্রাম জেলার সব প্রান্তেই একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন কৃষকরা। শুধু কৃষিখাতের সেচ নিয়ে নয়, জেলার বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত নৌপথেও শ্যালো ইঞ্জিনের জ্বালানী সরবরাহ নিয়ে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সংকটের কথা স্বীকার করে কুড়িগ্রাম জেলা ফুয়েল পাম্প ওনার্স এ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোঃ জামান আহমেদ বলেন, ‘ ফিলিং স্টেশনগুলোতে জ্বালানী তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে।
বিপিসি থেকে জ্বালানী তেল সরবরাহের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে তাতে জেরিকেন বা ড্রামে তেল বিক্রি করার সুস্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। ফলে ফিলিং স্টেশনগুলো ড্রাম ও জেরিকেনে তেল বিক্রি বন্ধ রেখেছে। কৃষকরা জেরিকেনে ডিজেল নিতে এসে ফিরে যাচ্ছেন। সরকারি নির্দেশনা পেলে আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামার বাড়ির উপপরিচালক মোঃ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বোরো ধানের এটি সেচ মৌসুম। এ সময় ধানের চারাগাছের শিকড় ভেজা থাকা জরুরি। সেচের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকার তালিকায় রয়েছে।
জ্বালানী সরবরাহে সাময়িক সমস্যার বিষয়টি নিয়ে আমরা স্থানীয় প্রশাসনের পাশাপাশি সরকারের উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করছি।’ কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) বি.এম কুদরত-এ-খুদা বলেন, ‘ বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে।
কৃষকদের সেচের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। জেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসারদের নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে যাতে কৃষকরা জ্বালানী তেল প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পান। সে অনুযায়ী ফিলিং স্টেশনগুলোতে তারা নির্দেশনা দেবেন।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন