কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রাণীবৈচিত্র্য রক্ষায় স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থাপনার দাবি
আনোয়ার সাঈদ তিতু,
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি:-
কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী উপজেলায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমতে শুরু করায় চরাঞ্চল ও তীরবর্তী এলাকায় এখন ছোট মাছ ধরতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। নদের পানি হ্রাস পেয়ে ছোট ছোট নালা ও ‘দহ’ বা গর্তে মাছ আটকে পড়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবীরা সহজেই দেশি মাছ আহরণ করছেন।
তবে জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার কারণে মৎস্য সম্পদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা। নদের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় টেকসই ব্যবস্থাপনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদীর নির্দিষ্ট কিছু গভীর অংশকে সরকারিভাবে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে হবে। শুকনো মৌসুমেও সেখানে পর্যাপ্ত পানি নিশ্চিত করতে খনন বা ড্রেজিং করতে হবে।
শুধু নদীর ওপর নির্ভর না করে মৎস্যজীবীদের সমাজ ভিত্তিতে খাঁচায় মাছ চাষ বা বদ্ধ জলাশয়ে জলবায়ু সহিষ্ণু মাছের জাত চাষের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরামর্শ দেন তারা। সরেজমিনে রমনা ঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, ভোর থেকেই জেলেরা বিভিন্ন ধরনের জাল নিয়ে ব্রহ্মপুত্রের অগভীর অংশে ব্যস্ত সময় পার করছেন। জালে ধরা পড়ছে বৈরালি, কাজলি, টাকি, পুঁটি, টেংরাসহ বিভিন্ন ছোট প্রজাতির মাছ। পানি স্বচ্ছ ও কম গভীর হওয়ায় মাছের ঘনত্ব বেড়েছে, যা জেলেদের জন্য এক প্রকার আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্রহ্মপুত্রে মাছ ধরা মোঃ আশরাফুল ইসলাম (৫৫) বলেন, পানি কমলে মাছ ধরা সহজ হয় ঠিকই, কিন্তু আগের মতো বড় মাছ আর পাই না। এখন শুধু এই ছোট মাছ দিয়েই সংসার চলে। আরেক জেলে ধলু রাম (৪৯) বলেন, আগে এই সময়ে নদীতে হাঁটু পানি থাকতো না, এখন অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে বালুচর হয়ে গেছে। এখন নদী ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তাই মাছের থাকার জায়গাও কমে যাচ্ছে। নদী আন্দোলন কর্মী মোঃ জাহানুর রহমান খোকন বলেন, নদীর পানি কমে যাওয়ায় মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
একসময় এ ব্রহ্মপুত্র নদেই অর্ধশতাধিক দেশি মাছের প্রজাতি ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পানি শুকিয়ে যাওয়ায় অনেক মাছ ভাটিতে সরে গেছে, আবার কিছু প্রজাতি প্রায় বিলুপ্তির পথে। তিনি আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ব্রহ্মপুত্রের পানি দিন দিন শুকিয়ে যাচ্ছে এবং নদের তলদেশ ভরাট হয়ে উঠছে। কম পানিতে সহজে মাছ ধরা পড়ায় শুষ্ক মৌসুমে জেলেরা আপাতদৃষ্টিতে লাভবান হলেও এটি একটি ভয়ংকর দীর্ঘমেয়াদি সংকেত।
কারণ এভাবে মা মাছ ধরা পড়ছে, বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে মারাত্মক মাছের সংকট দেখা দেবে। মোঃ জাহানুর রহমান খোকন বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেই, তাহলে নদী ও নদীকেন্দ্রিক জীবন-জীবিকা দুটোই হুমকির মুখে পড়বে। জরুরি ভিত্তিতে পরিকল্পিত নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রবাহ স্বাভাবিক করতে হবে।
চিলমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মোঃ বদরুজ্জামান মিয়া বলেন, এই সময়ে পানি কমে যাওয়ায় মাছগুলো সংকীর্ণ জায়গায় চলে আসে, যা জেলেদের জন্য ইতিবাচক। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে অসময়ে নদী শুকিয়ে যাওয়া এবং উজানের পলি জমে নদের তলদেশ ভরাট হওয়া একটি বড় সমস্যা।
এতে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ক্ষেত্রগুলো নষ্ট হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা জেলেদের সচেতন করছি যেন তারা ছোট পোনা মাছ না ধরে এবং ক্ষতিকর ‘চায়না দুয়ারি’ জাল ব্যবহার না করে। কমপক্ষে ব্রহ্মপুত্র নদে খণ্ডকালীন ১০টি অভয়াশ্রম স্থাপন করে দেশি প্রজাতির মাছ সংরক্ষণ করতে হবে।
এছাড়া আধুনিক কলা কৌশলী, আইন এবং মাছ ধরার প্রশিক্ষণের আওতায় জেলেদের আনাতে হবে৷
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন