দেশের গণমাধ্যমের শীর্ষস্থানীয় পদে ব্যাপক রদবদল

ডিডি ডেস্ক:
শেখ হাসিনার পতনের পর গণমাধ্যমের শীর্ষ পদে রদবদল হয়েছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন পোর্টালের কমপেক্ষ ৩০-৩৫টি জায়গায় বিভিন্ন পদে এ রদবদল হয়। কয়েকটি মিডিয়ার মালিকানাও বদল হয়েছে।
গত ১৬ বছরের শাসনামলে বেশিরভাগ গণমাধ্যমই নিয়ন্ত্রিত মিডিয়ায় পরিণত হয়েছিল। শেখ হাসিনার জয়গান করাই ছিল এসব মিডিয়ার কাজ। টেলিভিশন, সংবাদপত্র ও অনলাইন মিডিয়ায় বড় বড় পদে থাকা কিছু সাংবাদিকের কাজই ছিল সরকারের তোষণ। দলীয় বাড়াবাড়ি এবং ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিকদের কোণঠাসা করে রাখা হয় বছরের পর বছর। জুলাই বিপ্লবের পর চিহ্নিত এসব সাংবাদিক কালো তালিকাভুক্ত হন গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রদের দ্বারা। অনেকে পালিয়ে যান নিজেদের অপকর্মের কথা স্মরণ করে। কেউ কেউ গ্রেপ্তার হন। এমন অবস্থায় মিডিয়া কর্তৃপক্ষ তাদের মিডিয়া সচল এবং টিকিয়ে রাখতে পেশাদার ও বিএনপিপন্থি সাংবাদিকদের নিয়োগ দেয়।
মূলত আওয়ামী লীগ আমলে এসব মিডিয়াকে বেশ বিতর্কিত ভূমিকায় দেখা গেছে। এসব গণমাধ্যমে কাজ করা অনেক সংবাদিকও তখন বেশ ফুলে-ফেঁপে উঠেছিলেন। হাসিনার প্রেস কনফারেন্সগুলোতে এসব গণমাধ্যমের সাংবাদিকদের চাটুকারিতা হাস্যরসের সৃষ্টি করত।
গণমাধ্যমে এখনো আওয়ামীপন্থি তথা ফ্যাসিবাদের দোসররা সদর্পে টিকে রয়েছেন। তবে প্রোপাগান্ডা সেল হিসেবে কাজ করা একাত্তর, সময় টিভিসহ বেশকিছু গণমাধ্যমের নিউজরুম পরিচালনায় পরিবর্তন এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানে আওয়ামীপন্থি সাংবাদিক হিসেবে পরিচিতদের কেউ কেউ কারাগারে, কেউবা হারিয়েছেন চাকরি। তাদের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আগে ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরা।
বর্তমানে গণমাধ্যমে এমন রদবদল ও সংস্কার বিষয়ে নরওয়েজিয়ান স্কুল অব থিওলজি, রিলিজিয়ন অ্যান্ড সোসাইটির সহযোগী অধ্যাপক ড. সাইমুম পারভেজ বলেন, ‘কর্তৃত্ববাদী হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের কর্মীদের একটি বড় অংশ হয় সরাসরি সরকারের অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন, না হয় চুপ থেকেছেন। হাসিনা শাসনামলে গণমাধ্যমকর্মীরা শাসক দলের নেতা নাকি গণমাধ্যমের কর্মী, তা পার্থক্য করা মুশকিল হয়ে পড়ত।’
এক অনুসন্ধানে বর্তমান মিডিয়া পরিস্থিতির একটি চিত্র পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানকালে সংশ্লিষ্ট মিডিয়াগুলোতে কী পরিবর্তন কিংবা রদবদল হয়েছে, তা উঠে এসেছে।
একাত্তর টিভি: এক সময়কার ক্ষমতাসীন দলের প্রধান প্রচারমাধ্যম হিসেবে পরিচিত একাত্তর টিভি বড় ধরনের রদবদলের মধ্য দিয়ে গেছে। এর কর্ণধার মোজাম্মেল বাবু বিতর্কিত ভূমিকার কারণে চাকরিচ্যুত হন। তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন বিএনপিসমর্থিত শফিক আহমেদ, যিনি প্রথমে বার্তাপ্রধান ও পরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পান। মোজাম্মেল বাবু একাত্তর টিভিকে শেখ হাসিনা সরকারের এমন প্রচারে নিয়োজিত করেন যে, অন্য টিভিও তাদের অস্তিত্বের জন্য একাত্তরকে অনুসরণ করতে বাধ্য হতো।
নাগরিক টিভি: বিপ্লবের পর নাগরিক টিভি থেকে ৪০ কর্মী ছাঁটাই হন, যাদের মধ্যে ২৫ জন সাংবাদিক। বার্তাপ্রধান দীপ আজাদসহ কয়েকজন সিনিয়র রিপোর্টারকে অপসারণ করা হয়।
ইস্ট-ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপ: বসুন্ধরা গ্রুপের মালিকানাধীন এ প্রতিষ্ঠানেও বড় পরিবর্তন এসেছে। সাংবাদিক নেতা কাদের গনি চৌধুরী এখন কোম্পানিটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি)। বিএনপি-ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আওয়ামীপন্থি দোসররা এখানে সেখানে রয়ে গেছেন। এ গ্রুপের
কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিন: দৈনিক কালের কণ্ঠের সম্পাদক ইমদাদুল হক মিলনের জায়গায় দায়িত্বে এসেছেন কবি হাসান হাফিজ। বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক নঈম নিজামের জায়গায় এসেছেন একই পত্রিকার আবু তাহের। তিনিও আওয়ামী সমর্থক। তবে পেশাদারত্বের ব্যাপারে সাংবাদিক আবু তাহেরের সুনাম রয়েছে। এ পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হয়েছেন মঞ্জুরুল ইসলাম। তিনি এক সময় বিএনপি সমর্থক সাংবাদিক ইউনিয়নের নেতা ছিলেন।
নিউজ টোয়েন্টিফোর ও বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম: বাংলানিউজের এডিটর জুয়েল মাজহারের জায়গায় সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লুৎফর রহমান হিমেল। নিউজ টোয়েন্টিফোরে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন ফরহাদুল ইসলাম ফরিদ। বসুন্ধরার টিভি চ্যানেল নিউজ টোয়েন্টিফোর-এর নির্বাহী সম্পাদক রাহুল রাহার জায়গায় ফরিদকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে বিএনপি সমর্থক হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরা চাকরি পেয়েছেন।
এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজে পরিবর্তন: মাহফুজুর রহমানের মালিকানাধীন এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজের শীর্ষ পদে পরিবর্তন এসেছে। এটিএন বাংলার নির্বাহী সম্পাদক জ ই মামুন ও এটিএন নিউজের বার্তাপ্রধান নুরুল আমীন ওরফে প্রভাস আমিনকে বরখাস্ত করা হয়েছে। মামুনের জায়গায় মতিউর রহমানকে এবং প্রভাষ আমিনের জায়গায় তার ডেপুটি শহীদুল আজমকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
ইনডিপেনডেন্ট টিভি: ইনডিপেনডেন্ট টিভির শীর্ষ দুই পদে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিতরা এখনো বহাল আছেন। তবে তাদের ক্ষমতা কিছুটা কমেছে। ২০১১ সাল থেকে সিইও ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন এম শামসুর রহমান (মোমেন) এবং বার্তাপ্রধান ছিলেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। শেখ হাসিনার পতনের পর টিভি পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন সাংবাদিক মোস্তফা আকমল। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে তার সুনাম রয়েছে। এই পদে থাকা আশিস সৈকতকে ৫ আগস্টের পর অফিসে আসতে নিষেধ করা হয়েছিল এবং তিনি সম্প্রতি পদত্যাগ করেছেন।
ডিবিসি টিভি: ডিবিসি টিভির শীর্ষ যে চার কর্মকর্তা চাকরি হারিয়েছেন তারা হলেন- সম্পাদক জায়েদুল আহসান পিন্টু, সম্পাদক প্রণব সাহা, বার্তাপ্রধান নইম তারিক এবং প্রধান বার্তা সম্পাদক মাসুদ কার্জন। হাসিনার আমলে তাদের বাড়াবাড়ি ছিল চোখে পড়ার মতো। সমকালের সহযোগী সম্পাদক লোটন একরাম ডিবিসিতে সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেছেন। তিনি বিএনপি বিটে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। চ্যানেলের চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী ও প্রধান সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম ৫ আগস্টের পর অফিসে আসেননি। তবে তাদের মালিকানা বহাল রয়েছে।
আরটিভি: বেঙ্গল গ্রুপের আরটিভিতে নতুন বার্তাপ্রধান হিসেবে যোগ দিয়েছেন ইলিয়াস হোসেন। তিনি আগে কালবেলার যুগ্ম বার্তা সম্পাদক ছিলেন এবং বাংলাভিশন, ইনডিপেনডেন্ট ও এসএ টিভিতেও কাজ করেছেন। তিনি বন্ধ থাকা চ্যানেল ওয়ানেও সাংবাদিকতা করেছেন। ইলিয়াস হোসেন ডিআরইউর সভাপতি ছিলেন। এর আগে আরটিভির বার্তাপ্রধান ছিলেন আসাদুল্লাহ মারুফ। ৫ আগস্টের পর তিনি এবং সিনিয়র সাংবাদিক শরিফ উদ্দিন লেমন চাকরি হারান। বিএনপি নেতা একেএম ওয়াহিদুজ্জামান আরটিভির পরিচালক হয়েছেন।
বৈশাখী টিভি: ডেসটিনি গ্রুপের বৈশাখী টিভির দীর্ঘদিনের বার্তাপ্রধান অশোক চৌধুরী পদ ছাড়তে বাধ্য হন। তিনিও ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে চিহ্নিত ছিলেন। তার জায়গায় যোগ দেন জিয়াউল কবির সুমন। তিনি আগে দিগন্ত টিভিতে কাজ করতেন। প্রধান বার্তা সম্পাদক সাইফুল ইসলামকেও তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তার জায়গায় তৌহিদুল ইসলাম শান্ত নিয়োগ পান, যিনি বিএনপি বিট কাভার করতেন।
এশিয়ান টিভি: এশিয়ান টিভির বার্তাপ্রধান বেলাল হোসেন ৫ আগস্টের পর চ্যানেল ছেড়ে চলে যান এবং পরে আর ফিরে আসেননি। তার জায়গায় সিরাজুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন। তিনি আগে রেডিও তেহরানে ব্রডকাস্ট সাংবাদিক হিসেবে কাজ করতেন। এ ছাড়া সময় টিভি ও মোহনা টিভিতে নতুন চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক দায়িত্ব নিয়েছেন।
দেশ টিভি: দেশ টিভির বিশেষ প্রতিনিধি মহিউদ্দিন ৫ আগস্টের পর প্রথমে প্রধান প্রতিবেদক এবং পরে বার্তাপ্রধান পদে নিয়োগ পান। আওয়ামী লীগ বিটের রিপোর্টার জয়দেব এবং সিনিয়র সাংবাদিক শামীমা আখতারকে চাকরিচ্যুত করা হয়। দেশ টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ হাসান বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলায় আটক হয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন। সাবেক পরিবেশমন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরী, যিনি এই টিভিতে নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদার ছিলেন; তিনি তা ছেড়ে দিয়েছেন।
দৈনিক কালবেলা: আওয়ামী লীগ আমলে জন্ম নেওয়া দৈনিক কালবেলা পত্রিকার মালিকানাও বদলে যাবার খবর রয়েছে। পত্রিকাটির একটি বড় অংশ বিক্রি করে বিএনপি সংশ্লিষ্ট এক নেতাকে নতুন অংশীদার হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে, সন্তোষ শর্মা কালবেলার মালিকানায় সম্পাদক পদে বহাল থাকছেন বলে জানা গেছে। দৈনিক কালবেলা সংবাদপত্রটি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৯৯১ সালে প্রথম প্রকাশনার অনুমতি পায়। তখন সম্পাদক ছিলেন আব্দুল মতিন। পত্রিকাটি হাতবদল হয়েছে। কালবেলা মিডিয়া লিমিটেডের পক্ষে দৈনিক পত্রিকাটির প্রকাশক সন্তোষ শর্মা। ২০২২ সালের সরকারি একটি বিজ্ঞপ্তি অনুসারে দৈনিক কালবেলার প্রত্যাহিক প্রচারসংখ্যা ছিল ১ লাখ ৪১ হাজার।
গাজী টিভি: গাজী টিভির সর্বময় কর্তা ইকবাল করিম নিশান বর্তমানে প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি বার্তাপ্রধান ছিলেন। ৫ আগস্টের পর চ্যানেলটির বিশেষ প্রতিনিধি গাওসুল আযম বিপুকে বার্তাপ্রধান করা হয়। যদিও প্রথমে তাকে প্ল্যানিং এডিটর পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তিনি দীর্ঘদিন বিএনপি বিটের রিপোর্টার ছিলেন।
সময় টিভি: ৫ আগস্টের পর সময় টিভি বেশ আলোচিত হয়। প্রতিষ্ঠানটির মালিক সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ জোবায়েরকে বরখাস্ত করে শম্পা রহমানকে নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। শম্পা রহমান সিটি গ্রুপের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমানের মেয়ে এবং সময় টিভির শেয়ারহোল্ডার। এ ছাড়া বার্তাপ্রধানসহ তিন কর্মী চাকরি ছাড়েন এবং গত ডিসেম্বরে কর্তৃপক্ষ প্রধান প্রতিবেদকসহ আরো পাঁচজনকে বরখাস্ত করে। সাবেক বিতর্কিত আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলামের ভাই মোরশেদুল ইসলাম এখনো সময় টিভির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছেন।
মোহনা টিভি: মোহনা টিভিতে ৫ আগস্টের পর নতুন বোর্ড অব ডিরেক্টর গঠন করা হয়। শুরু থেকে চ্যানেলটির চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার। তিনি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাকি পাঁচ শেয়ারহোল্ডার নতুন বোর্ড গঠন করে চ্যানেলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। নতুন চেয়ারম্যান হয়েছেন আতাহার আলী এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক হয়েছেন সজীব গ্রুপের এমএ হাশেম। সাংবাদিক শাহিন রাজা হেড অব এডিটোরিয়ালের দায়িত্ব পেয়েছেন।
একুশে টিভি: ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন একুশে টিভির প্রকৃত মালিক আব্দুস সালাম চ্যানেলটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তৃতা প্রচারের দায়ে শেখ হাসিনার সরকার তাকে তিন বছর জেলবন্দি রাখে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি একুশে টিভির দায়িত্ব নিয়েছেন। এরপর তিনি শীর্ষ পদে থাকা কয়েকজন সাংবাদিককে সরিয়ে তার পছন্দের সাংবাদিকদের নিয়োগ দেন। বার্তাপ্রধান রাশেদ চৌধুরীকে সরিয়ে তার স্থানে ডয়চে ভেলের সাংবাদিক হারুন অর রশিদকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যিনি এক সময় এই টিভিতে কাজ করতেন।
গ্লোবাল টিভি: সম্প্রতি এই টিভির প্রধান সম্পাদক করা হয়েছে সাংবাদিক নাজমুল আশরাফকে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বাংলাভাষীদের অনলাইন সংবাদমাধ্যম টিবিএন টোয়েন্টিফোরে কর্মরত ছিলেন। এর আগে তিনি দ্য ডেইলি স্টার, আরটিভি, যমুনা টিভি, এসএ টিভি ও দীপ্ত টিভিতে কাজ করেছেন।
প্রতিদিনের বাংলাদেশ: পত্রিকাটির সম্পাদক পদে পরিবর্তন ঘটে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে। সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি সরে গেলে পত্রিকাটির ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোরসালিন বাবলা ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলার গৌরব: বর্তমানে পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে রয়েছেন সাংবাদিক জোনায়েদ মানসুর। তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশর সিনিয়র সাংবাদিক ছিলেন। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে প্রতিদিনের বাংলাদেশ থেকে পদত্যাগ করে ওই মাসেই দৈনিক জবাবদিহির নির্বাহী সম্পাদক হন। পরে বাংলার গৌরবে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হন। পত্রিকাটি আগামী জুলাই মাসে বড় আকারে বাজারে আসার কথা রয়েছে। বাংলার গৌরব পত্রিকাটি হাত বদল হয়েছে। বাংলার গৌরব পত্রিকাটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার, বিএসসি। বাংলার গৌরবের পাশাপাশি জোনায়েদ মানসুর বিজনেসবিষয়ক বার্তা সংস্থা উদ্যোক্তা বাংলাদেশের সম্পাদকও। তিনি দৈনিক যায়যায়দিন, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ, দৈনিক স্বদেশ প্রতিদিন, দৈনিক আমাদের আলোকিত সময়, ব্রেকিংনিউজবিডি ডটকম, বাংলার চোখ (সংবাদ সংস্থা), দৈনিক আমাদের অর্থনীতিসহ বিভিন্ন দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকায় কাজ করেন।
সময়ের আলো: এই পত্রিকার জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক সাঈদ শাহনেওয়াজ করিম ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের পদে অধিষ্ঠিত হন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে সম্পাদক কমলেশ রায় পদ ছেড়ে দিলে এ পরিবর্তন ঘটে।
সমকাল: শেখ হাসিনার পতনের প্রায় এক মাস পর সমকাল পত্রিকার সম্পাদক আলমগীর হোসেন পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। সমকালের দুই জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মতে, সেপ্টেম্বরে একদল সংবাদকর্মী প্রকাশ্যে তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পদত্যাগের জন্য চাপ দেন। এরপর কর্তৃপক্ষ তাকে চুক্তি নবায়ন না করে অফিসে আসতে নিষেধ করে এবং হামীম গ্রুপের পরিচালক আবুল কালাম আজাদকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দেয়। গতকাল বুধবার পত্রিকাটিতে সম্পাদক হিসেবে যোগ দিয়েছেন শাহেদ মুহাম্মদ আলী। তিনি এর আগে কালের কণ্ঠের সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
যুগান্তর: যমুনা গ্রুপের মিডিয়ার মধ্যে যুগান্তর সম্পাদক পরিবর্তন হয়েছেন। দীর্ঘদিন সম্পাদক থাকা জাতীয় প্রেস ক্লাবের এক সময়কার সভাপতি সাইফুল আলম হত্যা মামলার আসামি হওয়ার পর জানুয়ারিতে সম্পাদক পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে যমুনা গ্রুপে তার চাকরি বহাল আছে। তার জায়গায় সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন কবি আবদুল হাই শিকদার, যিনি আমার দেশ ও দৈনিক ইনকিলাবে কাজ করেছেন। তিনি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য।
দেশ রূপান্তর:চলতি বছরের জানুয়ারিতে মোস্তফা মামুন পদত্যাগ করার পর দৈনিক দেশ রূপান্তরের সম্পাদক হন কামাল উদ্দিন সবুজ। তিনি দুই মেয়াদে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন। এর আগে তিনি বিএসএস ও ইউএনবিতে সাংবাদিকতা করেছেন। তিনি বাসস থেকে ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ মেয়াদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নিউজ কাভার করতেন।
দৈনিক ইত্তেফাক: দৈনিক ইত্তেফাকের বিশেষ প্রতিনিধি শ্যামল সরকার চাকরি হারান এবং ৫ আগস্টের পর অফিসে আসা বন্ধ করে দেন। নির্বাহী সম্পাদক করা হয়েছিল সালেহ উদ্দিনকে। তবে তিনি এখন অস্ট্রেলিয়ায়। পত্রিকার দায়িত্ব পালন করছেন না। ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হয়েছেন সাইদুল ইসলাম এবং যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আনোয়ার আল দীন।
যায়যায়দিন: এই পত্রিকায় নির্বাহী সম্পাদক ছিলেন অরুণ কুমার দে। গত মাসে ওই পদে নিয়োগ পেয়েছেন খুরশীদ আলম। খুরশীদ আলম ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক। সম্প্রতি যায়যায়দিন পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করে শফিক রেহমানকে ডিক্লারেশন ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভোরের আকাশ: সম্পাদক মনোরঞ্জন ঘোষালকে সরিয়ে ইলিয়াস উদ্দিন খানকে ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আলোকিত বাংলাদেশ: এই পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক শামীম সিদ্দিকী ৫ আগস্টের পর অফিসে যেতে পারছেন না। তার জায়গায় নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হবে। তবে বার্তা ফের যোগদান করেছেন মোরশেদুল আলম। এর আগে আলোকিত বাংলাদেশেই দুবারই বার্তা সম্পাদক ছিলেন তিনি দৈনিক নয়াদিগন্তসহ বিভিন্ন পত্রিকা চাকরি করেন।
সারাবাংলা ডটনেট: গাজী গ্রুপের মালিকানাধীন সারাবাংলা ডটনেট নিউজ পোর্টালটি গত বছরের সেপ্টেম্বরে বিক্রি হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী আগস্টে আটক হওয়ার পর পোর্টালটি আইটি প্রতিষ্ঠান আইসিসি কমিউনিকেশনের সাইফুল ইসলাম সিদ্দিকী কিনে নেন। মালিকানা বদলানোর পর উপসম্পাদক সন্দ্বীপন বসু ও প্রধান বার্তা সম্পাদক রহমান মুস্তাফিজ চাকরি হারান। পোর্টালের বিশেষ প্রতিনিধি গোলাম সামদানী নতুন হেড অব নিউজ হন।
এক পক্ষকে সরিয়ে আরেক পক্ষ গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করলেও সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যম পরিচালনায় সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ শোনা যায়নি।
আমার দেশ: পত্রিকাটি ২০১৩ সালে বন্ধ করে দেওয়ার সময় কর্মরত প্রায় সব সাংবাদিক বর্তমানে আমার দেশ-এ ফিরে এসেছেন। ১১ বছর বন্ধ থাকার পর পুরোনো ব্যবস্থাপনায় আমার দেশ গত ২২ ডিসেম্বর থেকে প্রকাশ হচ্ছে। ড. মাহমুদুর রহমানের সম্পাদনায় নির্বাহী সম্পাদক, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক, বার্তা সম্পাদক, ডেপুটি চিফ রিপোর্টার হিসেবে যথাক্রমে দায়িত্ব পালন করছেন সৈয়দ আবদাল আহমদ, জাহেদ চৌধুরী, ইলিয়াস হোসেন ও বাছির জামাল।
গণমাধ্যমের মালিকানা: গণমাধ্যমের মালিকানায় বিভিন্ন ব্যবসায়ী গ্রুপ রয়েছে। বসুন্ধরা গ্রুপ ইস্ট ওয়েস্ট মিডিয়া গ্রুপের মাধ্যমে সাতটি গণমাধ্যম পরিচালনা করছে, যার মধ্যে কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ডেইলি সান ও নিউজ২৪ অন্যতম। এস আলম গ্রুপ ব্যাংক লুটের অভিযোগের মধ্যে নেক্সাস টিভি ও স্টার নিউজ চালু করে। এ গ্রুপের পত্রিকার নাম খবরের কাগজ, অনলাইন বার্তাটোয়েন্টিফোর, ইংরেজি পত্রিকা বাংলাদেশ ফার্স্ট ও স্পোর্টস বাংলা। ট্রান্সকম গ্রুপ দ্য ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো পরিচালনা করে। মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশন কোম্পানি এটিএন বাংলা ও এটিএন নিউজ চ্যানেল পরিচালনা করে। গাজী গ্রুপের গাজী টেলিভিশন এবং মেঘনা গ্রুপের একাত্তর টিভি উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়াও রেনেসাঁ গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ, কর্ণফুলী গ্রুপ, সিটি গ্রুপ, কাজী ফার্মস, ইমপ্রেস গ্রুপ, এসএ টিভি, চ্যানেল নাইন, এজি গ্রুপ, বেস্ট গ্রুপ, গ্লোব ফার্মা, মোহাম্মাদী গ্রুপ এবং অন্যান্য গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন মিডিয়া প্রতিষ্ঠান রয়েছে।
সূত্র : আমার দেশ ও নিজস্ব প্রতিবেদক
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন