বৃহত্তর নির্বাচনি জোট গঠনের পথে বিএনপি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মেরূকরণ তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনে অংশ নিতে কোন দল কার সঙ্গে জোট করবে বা আসন সমঝোতায় যাবে, তা নিয়ে চলছে তৎপরতা ও আলোচনা।
দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি একটি বৃহত্তর নির্বাচনি জোট গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। দলটির নেতৃত্বে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনে’ যুক্ত দলগুলোর সঙ্গেই এ নিয়ে আলোচনা চলছে। ইতোমধ্যে বিএনপি এসব দল ও জোটের কাছে সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা চেয়েছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘সবুজ সংকেত’ও দিয়েছে।
বিএনপির উদ্যোগে বড় জোটের প্রস্তুতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, “বৃহত্তর নির্বাচনি জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আমরা যাদের সঙ্গে কথা বলছি, সময়মতো জানানো হবে।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য উদার গণতান্ত্রিক, ইসলামি ও আলেম নেতৃত্বাধীন দলগুলোকেও সঙ্গে নিয়ে একটি বৃহৎ নির্বাচনি জোট গঠনের পরিকল্পনা করছে।
যুগপৎ আন্দোলনের অংশ ছিল এমন দল ও জোটগুলোর মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্র মঞ্চ, ১২ দলীয় জোট, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট, গণফোরাম, লেবার পার্টি, বাংলাদেশ পিপলস পার্টি (বিপিপি) ও গণঅধিকার পরিষদ।
মিত্র দলগুলোর অবস্থান:
১২ দলীয় জোটের প্রধান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, “বিএনপির সঙ্গে আমরা যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম। নির্বাচনে একসঙ্গে অংশ নেব। ইতোমধ্যে ৩০-৩৫টি আসনের তালিকা দিয়েছি।”
গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরী জানান, তারাও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা জমা দিয়েছেন। এলডিপির মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমেদ বলেন, “২০১২ সাল থেকে বিএনপির সঙ্গে আছি। এবারও থাকব।”
বাম ঐক্যের আবুল কালাম আজাদ, জাতীয় পার্টির (বাংলাদেশ) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ, জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ এবং লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানও বিএনপির জোটে থাকার কথা নিশ্চিত করেছেন।
গণতন্ত্র মঞ্চের শর্ত:
গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা জানিয়েছেন, তারা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির জোটে যোগ দেননি, তবে আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা চলছে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, “আমরা বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ছিলাম। এখন আসন সমঝোতা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত আছে।
মঞ্চের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, “আমরা বিএনপির সঙ্গে তালিকা তৈরি করছি। তবে শুধু আসন নয়, রাজনৈতিক অবস্থানও বিবেচনায় থাকবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক হাসনাত কাইয়ুম বলেন, “ইলেকটোরাল পলিটিক্স নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা চলছে। সিদ্ধান্ত হবে পরিস্থিতি বিবেচনায়।
অন্যান্য দল ও আলোচনা:
গণঅধিকার পরিষদ জানিয়েছে, তারা তফসিল ঘোষণার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, “আমরা বিএনপির সঙ্গে ২০২২ সাল থেকে আছি। ৫০টি আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছি। বাকি আসনেও দেবো।
এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু জানান, তার দল আপাতত স্বতন্ত্রভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যদিও বিএনপির সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চলছে।
বিএনপি বাম দল সিপিবির সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে বলে জানা গেছে। তবে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি।
এনসিপি ও বিএনপি যোগাযোগে:
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)ও বিএনপির সঙ্গে জোটে যোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করছে। এনসিপির নেতা আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, “আমরা এখনো কোনো জোটে যাইনি, তবে কয়েকটি বৈঠক হয়েছে।
সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে এনসিপির মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দলের একটি অংশ জামায়াতের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে।
ইসলামি দলগুলোর সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগ:
জামায়াতের বাইরে ইসলামি দলগুলোকেও ঐক্যের আওতায় আনতে চায় বিএনপি। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ বিভিন্ন ধর্মভিত্তিক দলের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে জমিয়তের নেতা মাওলানা জুনায়েদ আল হাবীবকে প্রার্থী করতে বিএনপি ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে। লালবাগে খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককেও প্রার্থী করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ জানান, “২৫ অক্টোবর দলের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আলেমদের সঙ্গে যোগাযোগ:
এছাড়া দেশের বিভিন্ন মাদরাসা ও আলেম সমাজের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে বিএনপি। হাটহাজারী মাদরাসা, ছারছীনা দরবার ও আলিয়া ধারার প্রবীণ আলেমদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছে দলটির নেতারা।
বিএনপির এক নেতা বলেন, “আমরা এমন একটি ঐক্য চাই, যেখানে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ একত্রিত হবে। বিভাজন নয়, ঐক্যের রাজনীতি করতে চাই।”
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন