৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ রংপুর পীরগাছার ইউএনও নাজমুল হকের বিরুদ্ধে

৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ রংপুর পীরগাছার ইউএনও নাজমুল হকের বিরুদ্ধে
রিয়াজুল হক সাগর,
রংপুর:
রংপুরের পীরগাছার অন্নদানগর ইউনিয়নের শল্লারবিল আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি ভরাট করা হয়েছে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে। ওই মেশিন বসিয়ে নামমাত্র মাটি ভরাট করে প্রকল্পের ৫৬৬ মেট্রিকটন গম তুলে আত্মসাত করার অভিযোগ উঠেছে।
এ অভিযোগ সদ্যবদলি পিআইও আব্দুল আজিজ এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা আমিনুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তবে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের নেপথ্যে ছিলেন ইউএনও মো. নাজমুল হক সুমন বলে অভিযোগ রয়েছে।সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, শুধু ওই প্রকল্পের ৫৬৬ মেট্রিকটন গম তুলে আত্মসাতেই করা হয়নি, ওই প্রকল্পে ঘিরে তিন ধরনের ব্যবসা করা হয়েছে।
প্রথমত্ব: আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি ভরাটের নামে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলন করে ৫৬৬ মেট্রিকটন গম আত্মসাত করা হয়েছে, দ্বিতীয়ত্ব: সেই বালু অন্যত্রে বিক্রি করে অর্ধকোটি টাকার বানিজ্য করা হয়েছে এবং তৃতীয়ত্ব: ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলনের ফলে সেখানে পুকুর সৃষ্টি হওয়ায় সেই পুকুরে মাছ চাষ করে অর্ধকোটি টাকার মাছ বিক্রি করা হয়েছে।
চেয়ারম্যান, পিআইও এবং ইউএনও ওই প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে তিন ধরণের ব্যবসা করে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও সেখান থেকে বালু উত্তোলনের ফলে যেকোনো মুহুর্তে ধ্বসে যেতে পারে আশ্রয়ণ প্রকল্পটি বলে আশঙ্কা এলাকাবাসীর।
এছাড়াও আশ্রয়ণের পাশেই পুকুর সৃষ্টিসহ গভীরতা হওয়ায় আশ্রয়ণের বাসিন্দারা তাঁদের শিশু সন্তানদের নিয়ে আছেন আতঙ্কে।সূত্রে জানিয়েছে, ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমান অনুযায়ী ৫ থেকে ৬ ফিট উঁচু করে মাটি ভরাট করা কথা ছিল। কিন্তু তা করা হয়নি। হয়েছে দেড় থেকে ৩ ফিট উঁচু।
এ নিয়ে গত জুনের শেষের দিকে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো মোবাশ্বের হাসান তদন্ত কমিটি গঠণ করে দিয়ে ছিলেন। কমিটি তদন্ত করে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে কাজ মানসম্মত হচ্ছে না বলে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। ইউএনও ও পিআইও’র বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই বদলি হয়ে যান জেলা প্রশাসক ।
জানা গেছে, ১০-১২ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পের ৩২০টি বাড়ি। বাড়ির নির্মাণ কাজ শুরুর আগে সেখানে ৫-৬ ফিট উচু করে মাটি ভরাটের জন্য সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৫৬৬ মেট্রিকটন গম বরাদ্দ নেওয়া হয়। প্রকল্পের চেয়ারম্যান করা হয় আমিনুল ইসলামকে। তিনি ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামীলীগের ইউনিয়ন সভাপতি। ওই প্রকল্পের টাকা আত্মসাত করার উদ্দেশ্যে পিআইও এবং ইউএনও’র যোগসাজসে আমিনুল ইসলাম আশ্রয়ণ প্রকল্প ঘেঁষেই সরকারি জমিতে কয়েকটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে প্রায় ২ মাস ধরে বালু উত্তোলন করেন।
এলাকার খন্দকার মাহবুবার রহমান টিটুল অভিযোগ করে বলেন, ‘ড্রেজার মেশিন অবৈধ। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশেই সেই অবৈধ মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হয়। পাইপের সাহায্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাঠে বালু-মাটি দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ৩-৪টি ড্রেজার মেশিন দিয়ে সেখান থেকে প্রায় ২ মাস বালু উত্তোলন করা হয়েছে। সেই উত্তোলন করা বালুর বেশির ভাগ অন্যত্রে বিক্রি করা হয়েছে। ইউপি সচিব আমজাদ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘শুনেছি ড্রেজার মেশিন দিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান বালু উত্তোলন করে বিক্রি করেছেন। তিনি ক্ষমতার জোরে সরকারি পুকুরে মাছ চাষও করেছিলেন।
মাটি ভরাটের নামে প্রকল্পের কাবিখার গম লুট করা হয়েছে। তবে সেখানে কত গম বরাদ্দ ছিল তা আমি জানি না। গোবড়াপাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক আব্দুর রশিদ অভিযোগ করে বলেন, ‘ড্রেজার মেশিন দিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে ২০ লাখ টাকারও মাটি-বালু ভরাট করা হয়নি। কিন্তু সেটি ভরাটের জন্য সরকারি বরাদ্দ ছিল ৫৬৬ মেট্রিকটন গম।যার সরকারি মূল্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ‘সরকারি বরাদ্দের এক টাকারও ওইপ্রকল্পে মাটি ভরাটের কাজে লাগেনি। চেয়ারম্যান প্রকল্পের সভাপতি হওয়ার সুযোগে সেখানে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে ওই মাঠে মাটি ভরাট করে প্রায় ৪০ লাখ টাকার বালু অন্যত্রে বিক্রি করেছেন এবং সেখানে পুকুর সৃষ্টি হওয়ায় সেই পুকুরে মাছ চাষ করেও অর্ধকোটি টাকা পকেটজাত করেছেন।
আওয়ামীলীগ সরকার পতনের পর পুকুরের কিছু মাছ ছিল তা সাধারণ জনগন তুলে নিয়ে গেছেন। ওই ইউপি চেয়ারম্যানও চলে যান আত্মগোপনে।ওই ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান আকবর আলী অভিযোগ করে বলেন, ওই প্রকল্পে মাটি ভরাটের জন্য যে ৫৬৬টন গম বরাদ্দ ছিল। যদি শ্রমিক দিয়ে মাটি ভরাট করা যেত, তাহলে এলাকার অনেক শ্রমিকের কিছুদিন সেখানে কর্মসংস্থান হতো। তা না করে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করে প্রকল্পের টাকা লুট করা হয়েছে। এতে দু’তিনজন লাভবান হয়েছেন।
কিন্তু সেখানে ড্রেজার মেশিন বসানোর কারণে আশ্রয়ণ প্রকল্প ধ্বসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ওই প্যানেল চেয়ারম্যান আরও অভিযোগ করে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি ভরাটের নামে তিন ধরনের ব্যবসা করা হয়েছে। ওই ঘটনায় সঠিক তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির দাবি করেন প্যানেল চেয়ারম্যান। সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়,ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাটি ভরাটের কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে ৩২০টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে জোরেশোরে।
তবে সেখানে দুইটি ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাইপের সাহায্যে আশ্রয়ণের ঘরে বালু-মাটি ফেলা হচ্ছে। ড্রেজার মেশিন চালক আবুল কালাম বলেন, ‘ইউএনও’র নির্দেশে প্রতিটি ঘরে বালু-মাটি ফেলছি। বালু উত্তোলনের ফলে আশ্রয়ণ প্রকল্প ঝুঁকির মধ্যে থাকবে কী না-জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমি জানি না। তবে ঝুঁকির মধ্যে থাকলে কী ইউএনও এখানে মেশিন লাগাতে দিতেন! আমরাতো প্রশাসনেরই কাজ করছি। আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রাশেদা বেগম বলেন, ‘মেশিন দিয়ে বালু তোলায় আশ্রয়নের পাশে পুকুরে গভীর পানি রয়েছে।
দুই নাতিকে সব সময় চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ওই পুকুরে যেকোনো মুহুর্তে বড় ধরণের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, কাবিখা প্রকল্প বাস্তবায়ন কোনো ভাবেই ড্রেজার মেশিন ব্যবহার করা যাবে না। কাবিখার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হবে শ্রমিক দিয়ে। শ্রমিকরা মজুরি হিসেবে কাবিখার গম পাবেন। কিন্তু সেই নীতিমালাকে ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে তোয়াক্কা করা হয়নি।
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন