কাশফুলেতেই জীবন-জীবিকা, হচ্ছে বাড়তি আয়ের সুযোগ
আনোয়ার সাঈদ তিতু,
কুড়িগ্রাম জেলা প্রতিনিধি:-
কাশফুলে ছেঁয়ে গেছে কুড়িগ্রামের জেলার বিভিন্ন বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। কুড়িগ্রাম জেলার ১৬টি নদ-নদীর অববাহিকায় জেগে ওঠা চার শতাধিক চর সেজেছে এই শুভ্র ফুলে। বাতাসে দুলে ওঠা কাশফুল দেখে মনে হয় সাদা মেঘের রাজ্য। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসছে এ সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
কাশফুল এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়; চরবাসীর বাড়তি আয়ের উৎসও হয়ে উঠেছে। চরাঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্ম নেওয়া কাশগাছ এখন স্থানীয় কৃষকদের জীবিকায় সহায়ক। কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন এলাকায় এসব কাশগাছ কেটে বিক্রি করে বাড়তি আয় করছেন অনেকে। এতে বিনা চাষে আয়ের সুযোগ পাচ্ছেন অনেক কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ।
কুড়িগ্রাম জেলায় আছে ১৬টি নদ-নদী এবং সাড়ে চার শতাধিক চরাঞ্চল। কুড়িগ্রাম জেলার ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার, ধরলা, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীর চরে এখন দিগন্তজোড়া সাদা কাশফুলে মুখর প্রকৃতি। এসব চরে তুলার মতো সাদা ফুল দুলছে বাতাসে। যতদূর চোখ যায়, মনে হয় প্রকৃতি সাদা রেশমি শাড়ি পরে সেজেছে। প্রতিদিন ভিড় জমছে দর্শনার্থীর। ছবি তুলছেন, কাশফুল হাতে পোজ দিচ্ছেন। উপভোগ করছেন প্রাকৃতিক রূপ। শিশুরা ছুটে বেড়াচ্ছে কাশবনের ভেতর। এসব চরে নদী থেকে ভেসে আসা খোলা হাওয়া আর শুভ্রতা বিলানো কাশফুলের মায়ায় অন্য রকম আনন্দ খুঁজে পান সবাই। অবসর দিনে শহরের যান্ত্রিক জীবন ছেড়ে চোখ জুড়াতে মানুষ খুঁজে নিচ্ছেন কাশফুলের শুভ্রতা।
কাশফুলের সৌন্দর্য শুধু প্রকৃতিপ্রেমীদের নয়, স্থানীয় কৃষকদের কাছে বাড়তি আয়ের উৎস। বিনা চাষে বেড়ে ওঠা কাশগাছ কেটে বিক্রি করছেন তারা। চরবাসীর কাছে এটি এখন জীবিকায় সহায়ক হয়ে উঠেছে।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র পাড়ের কৃষক মোছাঃ খোদেজা বেগম বলেন, ‘হামার সাত বিঘা জমিত কাশ হইছে। কোনো আবাদ করা নাগে না; এমনি হয়। গতবার ২২ হাজার টাকা কাশ বিক্রি করে পাইছি।’
কুড়িগ্রাম জেলা সদর উপজেলার ধরলা নদীপাড়ের স্থানীয় কৃষক মনসের আলী বলেন, মাসখানেক গেলে কাশফুল কাটব। জেলার বাইরে এর প্রচুর চাহিদা। ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা পর্যন্ত মণ হিসেবে বিক্রি হয়।
স্থানীয়ভাবে কাশের ব্যবহারও নানামুখী। চরাঞ্চলে গোখাদ্য, ঘরের বেড়া তৈরিসহ নানা কাজে এর চাহিদা বাড়ছে। জেলার বাইরে, বিশেষ করে রাজশাহী ও বরিশাল অঞ্চলে পানের বরজ তৈরিতে কাশগাছের বেশ চাহিদা। ফলে কুড়িগ্রাম থেকে নিয়মিত এসব অঞ্চলে পাঠানো হয় কাশগাছ।
কাশফুল দেখতে আসা স্থানীয় তরুণ মোঃ রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের কুড়িগ্রামের বিভিন্ন চরজুড়ে ব্যাপক কাশগাছ হয়েছে। কাশফুল সত্যিই মনোমুগ্ধকর। পর্যটন হিসেবে যদি এটাকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা যায়, তাহলে এ খাতে জেলার বড় সম্ভাবনা আছে।’
আরেক দর্শনার্থী মোছাঃ শিউলি খাতুন বলেন, পরিবারসহ ঘুরতে এসেছি। বাড়ির কাছে এত সুন্দর কাশবন! জানতাম না; খুব ভালো লাগছে। স্থানীয়দের মতে, শরৎকালে কাশফুল ঘিরে পর্যটনের বড় সম্ভাবনা থাকলেও এ নিয়ে কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই। সঠিক পরিকল্পনা নিলে কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল হতে পারে শরৎকালীন পর্যটনের আকর্ষণীয় কেন্দ্র।
কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও উদ্ভিদবিদ মীর্জা মোঃ নাসির উদ্দিন বলেন, ‘কাশফুল শুধু সৌন্দর্যের নয়, এর ঔষধি ও ভেষজ গুণ রয়েছে। এটি জ্বালানি ও ছাউনি তৈরিতেও ব্যবহার হয়। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে কাশগাছ উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ থেকে বড় ধরনের আয় সম্ভব। একই সঙ্গে পর্যটন বিকাশেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন