বুধবার; ৪ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬ খ্রি. Dashboard

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন দিন
সর্বশেষ :
কাউকে নতুন করে স্বৈরাচার হতে দেওয়া হবে না: সারজিস আলম চাঁপাইনবাবগঞ্জে শ্রমিকদের দক্ষতা ও শব্দ দূষণ বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ চাঁপাইনবাবগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজে বার্ষিক ক্রীড়া, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে ৫ ফেব্রুয়ারি জামায়াত আমীর ডা. শফিকুল রহমানের নির্বাচনী জনসভা ৯ম পে-স্কেল বাস্তবায়নের দাবিতে কুড়িগ্রামে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ ও কর্মবিরতি পালন

কোরআন ও হাদিসের আলোকে তওবার গুরুত্ব

প্রকাশিত: সোমবার; ১৮ আগস্ট, ২০২৫ খ্রি. - ০৬:২২ পি.এম. | দেখেছেন: ৫৬৩ জন।

কোরআন ও হাদিসের আলোকে তওবার গুরুত্ব

 

তওবা শব্দের অর্থ হলো ফিরে আসা। অর্থাৎ মানুষ প্রতিনিয়ত ভুল করে, অন্যায় করে, পাপ করে, গুনাহ করে, এসব যাবতীয় কাজ করে সে যখন অনুতপ্ত ও লজ্জিত হয়ে সেসব নিন্দনীয় কাজ আর ভবিষ্যতে না করার সংকল্প নিয়ে আল্লাহর দরবারে দৃঢ় সংকল্প করে আল্লাহর পথে ফিরে আসে তার নামই ‘তওবা’। 

মানুষ আশরাফুল মাখলুকাত এবং সেই সঙ্গে মহান আল্লাহর প্রতিনিধি। অথচ সেই মানুষ ষড়রিপুর তাড়নায় নানাবিধ পাপকর্মে লিপ্ত হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ মনুষ্যত্বের গুণাবলি হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য তওবা করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া অত্যাবশ্যক। মহান আল্লাহর দরবারে কায়ামনোবাক্যে তওবা ব্যতীত পাপ থেকে ক্ষমা পাওয়ার বিকল্প কোনো পন্থা নেই।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহতায়ালার ওপর শুধু তাদের তওবাই কবুলযোগ্য হবে, যারা অজ্ঞাতসারে গুনাহর কাজ করে অতঃপর জানা মাত্রই তারা দ্রুত তা থেকে ফিরে আসে, মূলত এরাই হচ্ছে সেসব লোক যাদের ওপর আল্লাহতায়ালা দয়া পরবশ হন।’ (সুরা নিসা, আয়াত ১৭)। 

 

তওবার সংজ্ঞা : তওবা আরবি শব্দ। এর বাংলা অর্থ অনুতপ্ত হওয়া, অনুশোচনা করা, ফিরে আসা বা প্রত্যাবর্তন করা। বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত ‘আধুনিক বাংলা অভিধান’-এ তওবা সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘পুনরায় পাপ না করার সংকল্পসূচক উক্তি।’ মূলত ভুলপথে ধাবিত বা পাপকর্মে লিপ্ত ব্যক্তি অনুশোচনায় জর্জরিত হয়ে ভবিষ্যতে ভুল বা পাপের পুনরাবৃত্তি হবে না এই নিশ্চয়তা প্রদান করে খালেছ দিলে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়াকে তওবা বলা হয়। ইচ্ছা বা অনিচ্ছায় মানুষের পাপ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক। সেই পাপ থেকে বাঁচার পথ ইসলাম ধর্মে সুস্পষ্ট বর্ণিত আছে। পাপমুক্ত জীবন গঠন ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য নিয়মিত তওবা করা অপরিহার্য। যে তওবার পর পাপকর্মের পুনরাবৃত্তি হয় না, তাকে ‘তওবাতুন নাসুহা’ অর্থাৎ খাঁটি তওবা বলে।

 

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেন, আল্লাহর কসম, আমি দৈনিক সত্তরবারের বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই। সুবহানাল্লাহ।

তওবা ইস্তিগফার পাপ থেকে মুক্তির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় মানুষ প্রতিদিনই গুনাহর কাজ করে যাচ্ছে। এ গুনাহ বা পাপ করা অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ পাপ হয়ে গেলেও ইসলাম ধর্মে তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার পথও বাতলে দেওয়া হয়েছে। যখন কোনো ব্যক্তি পাপ করে ফেলে তখন তাকে অত্যন্ত বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে। 

 

পবিত্র কোরআনের আলোকে তওবার গুরুত্ব : আল কোরআনে ‘সুরা তওবা’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সুরা রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন সুরার অনেক আয়াতে তওবার গুরুত্ব উপস্থাপিত হয়েছে এবং মুমিনদের তওবা করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। তওবা সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের উল্লেখযোগ্য কিছু আয়াত উপস্থাপন করা হলো-

আল্লাহ তওবা কবুলকারী : পবিত্র কোরআনে আল্লাহ ফরমান, ‘কিন্তু যারা তওবা করে এবং নিজেদের সংশোধন করে আর সুস্পষ্টভাবে যা গোপন করেছিল তা ব্যক্ত করে, এদেরই তওবা আমি কবুল করি, আর আমি তো পরম তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।’ (সুরা বাকারা ২ : আয়াত ১৬০)

তওবাকারীর জন্য পুরস্কার : ‘অবশ্য যারা তওবা করে, নিজেদের সংশোধন করে, আল্লাহর পথকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরে এবং আল্লাহর উদ্দেশে স্বীয় দীনে একনিষ্ঠ থাকে, তারা থাকবে মুমিনদের সঙ্গে। আর অচিরেই আল্লাহ মুমিনদের মহা পুরস্কার প্রদান করবেন।’ (সুরা নিসা ৪ : আয়াত ১৪৬)

তওবাকারীদের আল্লাহ ভালোবাসেন : ‘আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং যারা পবিত্র থাকে তাদেরও ভালোবাসেন।’ (সুরা বাকারা ২ : আয়াত ২২২)

তওবাকারীর জন্য জান্নাত : ‘হে মুমিনগণ যারা ইমান এনেছো! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো, খাঁটি তওবা। আশা করা যায় তোমাদের রব তোমাদের মন্দ কর্মসমূূহ মোচন করে দেবেন এবং তোমাদের দাখিল করবেন জান্নাতে, প্রবাহিত হয় যার নিম্নদেশে নহরসমূূহ।’ (সুরা তাহরিম ৬৬ : আয়াত ৮) সুতরাং মানুষ ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছকৃতভাবে পাপকর্ম করে যদি তার ভিতর পাপের জন্য অনুশোচনা এবং সৎ কর্ম করার প্রেরণা জাগ্রত হয়, অতঃপর সে যদি মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে তাহলে আল্লাহ তাঁর ‘গাফুর’ নামের বরকতে পাপী ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দেন এবং তাঁর ‘আত তাওয়্যাব’ নামের বরকতে পাপী ব্যক্তির তওবা কবুল করে থাকেন।

 

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, হে ইমানদার ব্যক্তিরা তোমরা গুনাহ খাতার জন্য আল্লাহর দরবারে তওবা কর, একান্ত খাঁটি তওবা। আশা করা যায় এর ফলে তোমাদের রব তোমাদের গুনাহগুলো ক্ষমা করে দেবেন এবং এর বিনিময়ে পরকালে তিনি তোমাদের জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। (সুরা আত তাহরিম, আয়াত ৮)।

তওবা কবুলের জন্য ইসলাম ধর্মে বেশ কয়েকটি দিকনির্দেশনা রয়েছে। আমাদের তা পরিপালন করতে হবে। এতে আশা করা যায় আল্লাহ আমাদের তওবা কবুল করবেন। জেনেবুঝে অন্যায় ও পাপ কাজে জড়িত হওয়া যাবে না। পাপ বা অন্যায় কাজ করে ফেলার পরপরই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। দেরি করা যাবে না। নিজের ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। মৃত্যুযন্ত্রণা শুরু হওয়ার আগেই ক্ষমা চাইতে হবে। দোয়া কবুলের ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা যাবে না। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধারণ করতে হবে। 

আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুল (সা.) বলেছেন, যখন বান্দা গুনাহ স্বীকার এবং অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন। সুবহানাল্লাহ। একজন তওবাকারী বান্দার জীবনে এর চেয়ে বড় সৌভাগ্যের আর কী হতে পারে?

অপরাধ, অন্যায় ও পাপ করার পর বান্দা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে তওবা করে আল্লাহর কাছে তা অধিক প্রিয় বলে বিবেচিত। আল্লাহ বলেন, হে ইমানদারগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (সুরা আন নুর, আয়াত ৩১)। 

আমাদের মনে রাখতে হবে ভালো কাজের জন্য যেমন পরকালে রয়েছে আল্লাহর কাছে পুরস্কার তেমনি মন্দ কাজের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। আর সেই কঠিন শাস্তি থেকে বাঁচতে হলে আমাদের সামনে একটি মাত্র পথ খোলা আর তা হলো তওবা করে ফিরে আসা। তওবার মূল উদ্দেশ্য হলো- আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিজের পাপ মোচন করে তাকে খুশি করানো। তওবা করলে আল্লাহ খুশি হন। বান্দাকে তিনি ক্ষমা করে দেন। 

আল্লাহ বলেন, ‘তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে বসে কিংবা নিজেদের ওপর জুলুম করে ফেলে তারা আল্লাহকে সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহর জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহতায়ালা ছাড়া আর কে আছে যে তাদের গুনাহ মাফ করে দিতে পারে?।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত ১৩৫)। 

 

হাদিসের আলোকে তওবার গুরুত্ব

হজরত রসুল (সা.) তওবার গুরুত্ব সম্পর্কে বহু হাদিস বর্ণনা করেছেন। যে হাদিসগুলো বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে একজন পাপী ব্যক্তি তওবা করে যাবতীয় পাপকর্ম থেকে মুক্ত হয়ে আলোকিত মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। আল্লাহর রসুল (সা.) আরও ফরমান, ‘রুহ কণ্ঠায় না পৌঁছা পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা বান্দার তওবা অবশ্যই কবুল করবেন।’ (তিরমিজি শরিফ, হাদিস নম্বর ৩৫৩৭) হজরত আবু হুরায়রাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসুল (সা.) ইরশাদ করেন, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহতায়ালা প্রত্যেক রাতের তিন ভাগের শেষ ভাগে (এক-তৃতীয়াংশ বাকি থাকতে) প্রথম আকাশে অবতরণ করেন এবং বলতে থাকেন কে আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আমার কাছে কিছু চায়, আমি তাকে  দেব। কে আমার কাছে ক্ষমা চায়, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস নম্বর ১১৩৪)

তওবা ভঙ্গকারীদের আল্লাহ পছন্দ করেন না : আল্লাহ পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, ‘আর তওবা তাদের জন্য নয়, যারা মন্দ কাজ করতেই থাকে, এমনকি যখন তাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হয়, তখন সে বলে : আমি এখন তওবা করছি; আর তাদের জন্যও নয়, যারা মারা যায় কাফের অবস্থায়। এরূপ লোকদের জন্যই আমি প্রস্তুত করে রেখেছি যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।’ (সুরা নিসা ৪ : আয়াত ১৮) সুতরাং স্পষ্ট যে, নির্দিষ্ট পাপের জন্য বান্দা অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে তওবা করলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন। কিন্তু একই পাপ বারবার করা এবং প্রতিবারই তওবা করা; এমন তওবা দয়াময় আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হবে না, অর্থাৎ সেই তওবা কবুল হবে না। সুতরাং বান্দাকে সতর্ক থাকতে হবে তওবা করার পর পাপের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

 

মানুষ প্রতিনিয়ত শয়তানের প্ররোচনায় পড়ে জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহতায়ালার আদেশ-নিষেধ লঙ্ঘন করে গুনাহ, অন্যায় আর পাপ কাজ করে ফেলে। তাই আল্লাহতায়ালা সেই গুনাহ থেকে তার বান্দাকে মুক্তি দেওয়ার জন্য তওবার ব্যবস্থা রেখেছেন। 

আদম (আ.) আল্লাহর কাছে এই বলে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন, হে আমাদের রব, আমরা আমাদের নিজেদের ওপর জুলুম করেছি, যদি তুমি আমাদের মাফ না কর এবং আমাদের ওপর দয়া না কর তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। (সুরা আরাফ, আয়াত ২৩)। 

আল্লাহ রব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে গুনাহর হাত থেকে রক্ষা করুন এবং প্রতিনিয়ত তওবা করার মাধ্যমে তাঁর প্রিয় বান্দা হওয়ার তৌফিক দান করুন।

 

 

 

সংগৃহীত:

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন